প্রমাণ ছাড়া স্বাস্থ্যকর পুষ্টিকর বলে প্রচার করা যাবে না

নিজস্ব প্রতিবেদক:
ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অনুভূতিতে আঘাত, বিজ্ঞাপনে বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতি, সমজাতীয় পণ্যের নিন্দা, নিজেদের পণ্যের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি, প্রমাণ ছাড়া স্বাস্থ্যকর বা পুষ্টিকর বলে প্রচার, মানুষের সরলতাকে প্রতারণাপূর্ণ ও চাতুর্র্যের মাধ্যমে ভঙ্গ করা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ বাধাগ্রস্ত হয়- এমন প্রচার বাতিলসহ আরও একগুচ্ছ বিধি-নিষেধ নিয়ে ‘নিরাপদ খাদ্য (বিজ্ঞাপন ও দাবি) প্রবিধানমালা’ এর খসড়া তৈরি করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।

সোমবার রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অডিটরিয়ামে এ খসড়া প্রবিধানমালা উপস্থাপন করা হয়।

এরপর এ বিষয়ে ব্যবসায়ী এবং অংশীজনদের মতামত গ্রহণ করা হয়েছে। সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আব্দুল কাইউম সরকার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইসস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. নাজমা শাহীন। প্রবিধানমালা উপস্থাপন করেন কর্তৃপক্ষের সদস্য রেজাউল করিম। প্রস্তাবিত প্রবিধানমালায় বিজ্ঞাপনের সাধারণ শর্তের মধ্যে রয়েছে বিজ্ঞাপনের ভাষা, দৃশ্য, চিত্র, কিংবা নির্দেশনা ধর্মীয় অনুভূতি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক অনুভূতির প্রতি পীড়াদায়ক হতে পারবে না। একই সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমন কিছু দেখানো যাবে না। সঙ্গে বাজারের প্রতিযোগী সমজাতীয় অন্য পণ্যের তুলনা বা নিন্দা করে শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করা যাবে না। এমন কোন বর্ণনা বা দাবি প্রচার করা যাবে না, যাতে জনগণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রতারিত হতে পারেন। পাশাপাশি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক অক্ষমতা বা দৈহিক আকার ও বর্ণকে কেন্দ্র করে কোন কিছু প্রচার করা যাবে না। একই সঙ্গে আমদানিপণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের চেয়ে উন্নতমানের, এমন কিছু বিজ্ঞাপনে থাকতে পারবে না।

শিশুদের নিয়ে বিজ্ঞাপনের বিষয়ে বলা হয়েছে, শিশুর স্বাভাবিক বিশ্বাস ও সরলতাকে প্রতারণাপূর্ণ ও চাতুর্যের সঙ্গে কাজে লাগিয়ে কিছু প্রচার করা যাবে না। শিশুদের পরনিন্দা, অশ্লীল শব্দ, ঝগড়া এবং ঝুঁঁকিপূর্ণ দৃশ্যে অংশ নেয়া বাদ দিতে হবে। এমন কিছু দেখানো যাবে না, যেখানে শিশুদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের নৈতিক, মানসিক বা শারীরিক ক্ষতি হতে পারে, এমন বিষয় বিজ্ঞাপনে থাকবে না এবং স্বাভাবিক বিশ্বাস ও সরলতাকে কাজে লাগানোর মতো কিছু প্রচার করা যাবে না। পাশাপাশি গুঁড়া দুধের প্যাকেটে শিশুদের জন্য উপযোগী নয় বলে উল্লেখ রাখার বিধান রাখা হয়েছে এ প্রবিধিমালায়। এছাড়া যে কোন খাদ্য বা পানীয়পণ্যের বিজ্ঞাপনে স্বাস্থ্যগত বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। এলার্জি বা অসহিষ্ণু প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা থাকলে, সেটা বিজ্ঞাপনে সুস্পষ্টভাবে প্রচার করতে হবে। এ প্রবিধিমালায় আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রে বলা হয়, এমন প্রচার করা যাবে না যাতে আমদানি পণ্য দেশী পণ্য থেকে উৎকৃষ্ট বলে মনে হয়।

বিজ্ঞাপনে দাবি প্রসঙ্গে বলা হয়, কোন অসত্য, অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর দাবি বিজ্ঞাপনে করা যাবে না। সুষম খাবার সকল ধরনের পুষ্টি সরবরাহ করতে পারে না, এমন প্রচার করা যাবে না। যে কোন দাবির কার্যকর প্রমাণ ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি থাকতে হবে। কোন পণ্য প্রাকৃতিক, আসল, বিশুদ্ধ, তাজা, খাঁটি, প্রসিদ্ধ বা ঐতিহ্যবাহী এমন ব্র্যান্ডনাম, ট্রেডমার্ক বা অভিনব নাম দাবি করা যাবে না। কোন পণ্যের বা কোম্পানির নাম এমন হয়ে থাকলে, পণ্যের প্যাকেট গায়ে ৩ মিলিমিটার অংশজুড়ে না দাবি বিবৃতি দিতে হবে। দেশে প্রস্তুত মোড়কজাত খাদ্যের সংশ্লিষ্ট তথ্যের ক্ষেত্রে বাংলার পাশাপাশি এক বা একাধিক বিদেশী ভাষাও ব্যবহার করা যাবে। আমদানি করা মোড়কজাত খাদ্য অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রির ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন বিদেশী ভাষায় হলে সেখানে বাংলাও সংযুক্ত করতে খসড়ায় প্রস্তাব করা হয়েছে।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতীত কোন খাদ্যে রোগের ঝুঁকি হ্রাসকারী বলে দাবি করা যাবে না। এমন প্রচারের জন্য ফিসহ আবেদন যাচাইবাছাই পূর্বক অনুমোদন দেবে কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও বিজ্ঞাপনে দাবির ক্ষেত্রেও পূর্ব অনুমতির বিধান রাখা হয়েছে এ প্রবিধিমালায়।

এসব বিধান ভঙ্গ করলে নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩’ এর ৪১ ও ৪২ ধারা অনুযায়ী ছয় মাস থেকে এক বছরের কারাদ- বা এক থেকে দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। দ্বিতীয়বার একই অপরাধে কমপক্ষে এক বছরের কারাদ- বা চার লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দ-ের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ক্ষেত্র বিশেষে আইনের লঙ্ঘনের সাজা নিরাপদ খাদ্য আইনের ধারা ৫৮,৫৯ ও ৬০ এর অনুযায়ী হতে পারে।

এ সময় আব্দুল কাইউম সরকার বলেন, আগে নিরাপদ খাদ্য (বিজ্ঞাপন) প্রবিধানমালা করা হয়েছিল। গত বছর সে আইন সম্পর্কে মতামত নিতে গিয়ে বিজ্ঞাপনের অসামঞ্জস্যপূর্ণ দাবির বিষয়টি সামনে আসে। এখন দাবির বিষয়গুলো সংযোজন করা হয়েছে। অংশীজনদের মতামত পাওয়ার পর প্রবিধানমালার খসড়া চূড়ান্ত করা হবে। এরপর এ নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা ও দাফতরিক প্রক্রিয়া শেষে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সেখানে ভেটিং শেষে গেজেটের মাধ্যমে তা কার্যকরের দিকে যাবে।

আরইউ